বরিশাল জেলা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।।

0
1138

Sharing is caring!

রির্পোট: অনলাইন ডেস্ক.

- Advertisement -

শাসন পূর্বে দনুজমর্দন দেব চতুর্দশ শতকে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। রোহিনী কুমার সেন রচিত ‘বাকলা’ গ্রন্থানুযায়ী চন্দ্রদ্বীপের সীমানা ছিল উত্তরে ঢাকা জেলার ইছামতি নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে মেঘনা নদী। চন্দ্রদ্বীপের রাজধানী সোনারগা – ইদিলপুর (হিজলা) – হোসেনপুর – ক্ষুদ্রকাঠী (বাবুগঞ্জ) ও সর্বশেষ মাধবপাশায় রাজধানী স্থাপন করা হয়েছিল। মাধবপাশায় পরিখা খনন – পানি সংরক্ষণের জন্য দুর্গাসাগর দীঘি খনন করা হয়। মূলত মগ ও পর্তুগীজ আক্রমনে বিপর্যস্ত হওয়ার কারণেই বারবার চন্দদ্বীপ রাজ্যের রাজধানী পরিবর্তিত হয়েছে। চতুর্দশ শতকে দনুজমর্দনের পর থেকে শুরু করে রাজা কন্দর্প নারায়ণ ১৬১১ সাল পর্যন্ত স্বাধীনভাবেই চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য শাসন করেন।
নবাব আলিবর্দি খাঁ যখন বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে বসেন (১৭৪০-৫৬) তখন আগা বাকের নামক একজন রাজপুরুষ তৎকালীন সেলিমাবাদ পরগণার সাড়ে এগার আনি এবং বুজর্গ উমেদপুর সম্পূর্ণ অধিকার করেন। আগা বাকের -এর নামানুসারে তখন এই জেলার নাম হয়েছিল বাকেরগঞ্জ।
ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার, বাকেরগঞ্জ থেকে জানা যায় – ১৭৯২ সালে সিভিল জজ ও সুন্দরবন কমিশনারের দপ্তর নলছিটির বাড়ৈইকরণ থেকে বাকেরগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়। আর বাকেরগঞ্জকে দপ্তর করে জেলা গঠিত হয় ১৭৯৭ সালে। কিছুদিনের মধ্যেই বাকেরগঞ্জ সংলগ্ন নদীতে চর পড়ার কারণে জেলা সদর স্থানান্তর নিয়ে শুরু হয় উপর মহলে পত্রালাপ। এই ধারাবহিকতায় ১৮০১ সালের ২৯ এপ্রিল ঢাকা কোর্ট অব সার্কিট বরিশালে জেলা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য গর্ভনর জেনারেলের নিকট সুপারিশ পাঠান। এই সুপারিশ অনুমোদন করেন গর্ভনর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি। ফলে ওই বছরের ১লা মে নিজামত আদালত জেলা সদর দপ্তর বাকেরগঞ্জ থেকে বরিশালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। তৎকালীন জেলা মেজিস্ট্রেট ও জজ মি. উইল্টন নিজামত আদালতের নির্দেশ অনুসারে জেলা সদর দপ্তর বরিশালে স্থানান্তর করেন।
সেই থেকে বাকেরগঞ্জ জেলা সদর বরিশালে স্থাপিত হয়। ১৮৩১ সালে সরকার বর্তমান বরিশালের তৎকালীন জমির মালিক রামকানাই রায়ের কাছ থেকে বরিশাল মৌজার পুরো জমি কিনে নেয়। ওই সময়ে সবমিলিয়ে বরিশাল শহরের আয়তন দাড়ায় ৩৮৫৬.৬৩ একর। ঢাকা সুপ্রিম কালেক্টরেট পৃথক হলে মি. হান্টার বরিশালের প্রথম কালেক্টরেট নিযুক্ত হন। মেজিস্ট্রেট দপ্তর পৃথক রইল।
কোলকাতায় সুপ্রিমকোর্ট স্থাপিত হওয়ার সাত বছর পরে অর্থাৎ ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে মফস্বলে সিভিল কোর্ট স্থাপিত হওয়ার আইন পাস হয়। তখন ইংরেজ শাসিত বঙ্গদেশের মধ্যে ১৮টি জেলার উল্লেখ পাওয়া যায়। তার মধ্যে বাকেরগঞ্জ অন্যতম।১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে সুজলা সুফলা এই অঞ্চলে চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে জেলা কালেক্টর মি. ডগলাস রেভিনিউ বোর্ডের কাছে এ সম্পর্কে এক বার্তা পাঠান। এতে বলা হয় – এই দুর্ভিক্ষে ষাট হাজার অধিবাসী প্রাণ হারিয়েছে এবং বহুসংখ্যক কৃষক একমুঠো ভাতের সন্ধানে বাস’ভিটা ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
প্রকৃতিই বরিশালবাসীকে সাহসী ও স্বাধীনচেতা করে তুলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে বাকেরগঞ্জের কৃষকেরা ইংরেজ শাসন এবং জমিদার গোষ্ঠীর বিরম্নদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠিত করে। এই বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন বোলাকি শাহ্।তিনি সুবান্দিয়ার গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সাহায্যে একটি ক্ষুদ্র দুর্গ নির্মাণসহ সৈন্যদল গঠন করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তবে কোম্পানির সেনাবাহিনী এবং জমিদারদের সংঘবদ্ধ আক্রমণের মাধ্যমে বিদ্রোহ অল্প কিছুদিনের মধ্যে দমন করা হয়।
অন্যান্য স্থানের মতো বরিশালের লবণ চাষিদের উপরও কোম্পানির শাসকগণ ভয়ঙ্কর উৎপীড়ন চালিয়েছিল। বেভারেজের গ্রনে’ জানা যায় – ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে বরিশাল অঞ্চলের ৩৫০টি মালঙ্গী পরিবার (যারা লবণ উৎপাদন করে) বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম (১৮৫৭) চলাকালীন সময়ে ফরায়েজীদের দমনে কোম্পানির শাসকবর্গ পীর মহম্মদ মহসীন ওরফে দুধু মিয়াকে গ্রেফতারসহ বরিশাল অঞ্চলে সৈন্যদল প্রেরণ করেছিল বলে জানা যায়।
১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে বাকেরগঞ্জ সীমানায় মাদারিপুর, কোটালীপাড়া জেলা ফরিদপুরভুক্ত হয়। মহকুমা স্থাপিত হওয়ার পূর্বে বাকেরগঞ্জের অধীনে কোটেরহাট, বাউফল, কাউখালি ও মেহেন্দিগঞ্জে মুন্সেফি চৌকি ছিল। সেখানে এক একজন মুন্সেফ বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এই বরিশাল বাঙালি সংস্কৃতির প্রাথমিক স্তরে সাহিত্য-সংগীত-নাট্যকলা সংস্কৃতিতে অবদান রেখেছিল। বরিশালবাসী নিজেদের মনোজগতের ভাব, কল্পনা ও গভীর জীবনদর্শনকে চর্যাপদের সুসংহত ভাষায় রূপ দিতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় সমৃদ্ধ হতে লাগল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি।বৃটিশ শাসনের পূর্বে পাঠান ও মোঘল আমলে রাজশক্তি এই অঞ্চলে তেমনটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম না হওয়ার ফলে বরিশালবাসীর সমাজ জীবনে যৌথ সামাজিক চেতনা গড়ে উঠেছিল সাবলীলভাবে।
বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর সমন্বয়ে এ অঞ্চলে যে মিশ্র সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বৃটিশ আমলে এসে তার পটপরিবর্তন ঘটে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব সমাজের সকল স্তরে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। মূলত এ কারণেই রাজধানী কোলকাতা কেন্দ্রিক নব্য সাহিত্য-সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশি দ্রুত গতিতে বরিশাল অঞ্চলে এসে প্রসার লাভ করে।বৃটিশ শাসনে বরিশাল তার সংগ্রামী ও বিপস্নবী চেতনার কারণে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদিদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।
শানিস্তবাদী নেতা মহাত্মা গান্ধি এজন্য বলেছিলেন, “যখন সমগ্র ভারত গভীর নিন্দ্রায় নিমগ্ন, তখন বরিশাল ছিল সদা জাগ্রত।” শিক্ষা, সংগ্রামী চেতনা ও সংস্কৃতিতে এই বরিশাল ছিল ‘পূন্যে বিশাল’। পাকিস্তান আমলেও বরিশাল তার সংগ্রামী চেতনার স্ফূরণ ঘটাতে পেরেছিল। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন ও তার পরবর্তী সময়ে বরিশালের বহু কৃতী সন্তান গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছিলেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির এই অগ্রসরতার কারণে বরিশালে শিক্ষার হার দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে বেশি। নারীদের শিক্ষা ও সচেতনতার হারেও অন্যান্য স্থানের চেয়ে বরিশাল এগিয়ে আছে।
ইতিহাস-2
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এটি ১৭৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরের পূর্বতন নাম চন্দ্রদ্বীপ। দেশের খাদ্যশষ্য উৎপাদনের একটি মূল উৎস এই বৃহত্তর বরিশাল। একে বাংলার ‘ভেনিস’ বলা হয়। বরিশাল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নদীবন্দর। উত্তরে চাঁদপুর, মাদারিপুর ও শরিয়তপুর জেলা; দক্ষিণে ঝালকাঠি, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলা; পূর্বে লক্ষ্মীপুর, ভোলা জেলা ও মেঘনা নদী এবং পশ্চিমে পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও গোপালগঞ্জ জেলা অবস্থিত।নদ-নদী- মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, বিষখালী, কীর্তনখোলা, তেতুলিয়া, কালাবদর, সন্ধ্যা ইত্যাদি।
বরিশালের নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, পূর্বে এখানে খুব বড় বড় শাল গাছ জন্মাতো; আর শাল গাছ থেকেই ‘বরিশাল’ নামের উৎপত্তি। আবার, কেউ কেউ দাবি করেন যে, পর্তুগীজ বেরি ও শেলির প্রেমকাহিনীর জন্য বরিশাল নামকরণ করা হয়েছে। অন্য এক কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, গিরদে বন্দরে (গ্রেট বন্দর) ঢাকার নবাবদের বড় বড় লবণের গোলা ও চৌকি ছিল। ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকরা বড় বড় লবণের চৌকিকে ‘বরিসল্ট’ বলতো। আবার, অনেকের ধারণা, এখানকার লবণের দানাগুলোর আকার বড় বড় ছিল বলে ‘বরিসল্ট’ বলা হতো। পরবর্তিতে এ শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে বরিশাল নামের উৎপত্তি হয়েছে।
সাধারন ইতিহাস- বাকেরগঞ্জে ম্যাজিস্ট্রেসি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৭৯৭ সালে রেগুলেশন-৭ অনুযায়ী বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ নিয়ে বাকেরগঞ্জ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন সময়ের প্রভাবশালী জমিদার আগা বাকের খানের নামানুসারে এ জেলার নামকরন হয়। ১৮০১ সালের ১লা মে স্যার জন শ্যোর এ জেলার সদর দপ্তর বর্তমানে বরিশাল শহরে স্থানান্তরিত করেন। পরবর্তীতে বরিশাল নামেই এ জেলা পরিচিতি পায়। ১৮১৭ সালে এজেলা একটি কালেক্টরেটে পরিণত হয়। ১৮২৯ সালে ঢাকা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে এই জেলা ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়। যে চারটি কালেক্টরেট নিয়ে ঢাকা বিভাগ বা কমিশনারশিপ গঠিত এটি তারই একটি। এটি কলকাতা থেকে প্রায় ১৮০ মাইল পূর্বে অবস্থিত ছিল। সেসময় জেলার আয়তন ছিল ৪,০৬৬ বর্গমাইল (১৮৭২ সাল অনুসারে) যা বর্তমান মাদারীপুর, বরিশাল, ঝালকাঠী, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ১৮৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘Calcutta Gadget’ থেকে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার সীমানার উল্লেখ পাওয়া যায়, তাতে বলা হয়, “বিশদভাবে এই জেলার উত্তরে ফরিদপুর, পশ্চিমে ফরিদপুর ও বলেশ্বর নদী যা যশোর থেকে পৃথক করেছে, দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্বে মেঘনা নদী ও এর মোহনা।”
যে গঙ্গা বা পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার সম্মিলিত জলরাশি বাহিত পলিমাটি দ্বারা গঠিত ব-দ্বীপের নিম্নভাগে এ জেলার অবস্থান, আর এটি ২১ ডিগ্রি থেকে ২৩ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯ ডিগ্রি থেকে ৯১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমায় অবস্থিত। সংক্ষেপে এর সীমারেখা হচ্ছে: উত্তরে ফরিদপুর, পশ্চিমে ফরিদপুর ও বালেশ্বর নদী ( এ নদী জেলাটিকে যশোর থেকে পৃথক করেছে), দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্বে মেঘনা ও তার মোহনা। উত্তর থেকে দক্ষিণে এ জেলার দৈর্ঘ্য হচ্ছে প্রায় ৮৫ মাইল আর দক্ষিণ শাহবাজপুর দ্বীপসহ এর প্রশস্ততা হচ্ছে প্রায় ৬০ মাইল। এর আয়তন হচ্ছে প্রায় ৪,৩০০ বর্গমাইল।
এ জেলায় গ্রাম ও শহরের সংখ্যা ৩৩১২ টি হবে বলে মনে হয়।

(Visited 60 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here